কর্মী ছাঁটাই বাড়ছে বেসরকারি খাতে

November 24, 2020, 4:08 pm

কর্মী ছাঁটাই বাড়ছে বেসরকারি খাতে

কম্পানির প্রচার ও বিক্রি বাড়াতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখেন বিপণনকর্মীরা। বাড়িতে, দোকানে, অফিসে গিয়ে নিজেদের কম্পানির পণ্যের গুণগান করেন তাঁরা। পণ্য বিক্রির বিশাল লক্ষ্য মাথায় নিয়ে কাজ করা এসব বিপণনকর্মীকে করোনার অজুহাতে কিংবা লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার কথা বলে ছাঁটাই করা হচ্ছে। শুধু বিপণনকর্মী বা কর্মকর্তা নন, বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান শীতে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় নীরবে কর্মী ছাঁটাই করছে।

গত মার্চে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার খবর সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়ার পর এবং সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনেক কর্মী কাজ হারান।

মো. খালেকুজ্জামান একটি বেসরকারি ব্যাংকের ডিরেক্টর সেলস এক্সিকিউটিভ পদে কাজ করতেন। চাকরি হারিয়ে এখন তিনি বাইক চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। রাস্তায় বাইক নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা খালেকুজ্জামান বলছিলেন, ‘কয়েক বছর আগেও বেস্ট ডাইরেক্ট সেলস এক্সিকিউটিভের পুরস্কার পেয়েছি। বছরে এফডিআর (স্থায়ী আমানত) এনেছি কয়েক কোটি টাকার। করোনা আঘাত হানার পর প্রথমে বেতন কমল, কিন্তু টার্গেট (লক্ষ্য) বাড়ল। তারপর কমল টার্গেট পূরণের কমিশন। সর্বশেষ হারালাম চাকরি। কিন্তু গ্রামের বাড়িতে থাকা বউ-বাচ্চা এসবের কিছুই জানে না। এখন বাইক চালিয়েই সংসার চলে।’

গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডের মাথায় সৌম্য চেহারার এক যুবক মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি করছিলেন। এই প্রতিবেদক মাস্কের দাম জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘আপনি মাস্ক কিনতে আসেননি।’ কিভাবে বুঝলেন? মুচকি হেসে যুবকটি বললেন, ‘মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলাম। কে প্রডাক্ট কিনবে, কে কিনবে না তা বুঝি।’ পরিচয় জানতে চাইলে নিজের নাম আরিফ জানিয়ে বললেন, করোনা দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ওষুধ কম্পানিগুলো। কিন্তু সেখানেও চলছে ছাঁটাই। তিনিও চাকরি হারিয়ে এখন রাস্তায় মাস্ক বিক্রি করছেন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা বলছে, বেসরকারি খাতে চাকরি করেন এমন ১৩ শতাংশ মানুষ করোনায় কাজ হারিয়েছেন। চাকরি আছে কিন্তু বেতন নেই এমন মানুষের সংখ্যা আরো বেশি। আর ২৫ শতাংশ চাকরিজীবীর বেতন কমে গেছে।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চাকরি আছে বেতন নেই এমন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁরা শহরে টিকতে না পেরে গ্রামে চলে যাচ্ছেন।

বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরি আছে, তবে বেতন নেই। যাঁরা এমপিওভুক্ত তাঁরা সরকারের দেওয়া বেতনটাই পাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান থেকে যা পেতেন সেটা এখন আর পাচ্ছেন না। যেসব শিক্ষক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন না, তাঁরা আরো বেশি সংকটে। অনেকে প্রাইভেট টিউশনি করে চলতেন। করোনার কারণে এখন সে আয়েও ধাক্কা লেগেছে।

পোশাক খাতে ৪৫ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর কয়েক লাখ শ্রমিক ও কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় কিছু লোক চাকরি ফিরে পেলেও এখনো বেকার প্রায় এক লাখ শ্রমিক।

বেসরকারি অনেক ব্যাংকই কর্মীদের বেতন কমিয়েছে। করোনাকালে সঞ্চয় বাড়লেও খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারা, সুদের হার ৯-৬ বাস্তবায়নসহ নানা কারণ দেখিয়ে সেখানেও চলছে কর্মী ছাঁটাই। ব্যাংকের আয় বাড়াতে প্রায় প্রতিটি কর্মীকেই এফডিআর, ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস) আনার লক্ষ্য ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য পূরণ না করতে পারলে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছিল ছয় কোটি ৩৫ লাখ (১৫-৬৫ বছর বয়সী)। এর মধ্যে ২৭ লাখ ছিল বেকার। সেই সঙ্গে কর্মক্ষম ছদ্মবেকারের সংখ্যাও প্রায় ৬৬ লাখ। করোনাকাল এই বেকার ও ছদ্মবেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। সূত্র: কালের কন্ঠ

Comments are closed.

এই বিভাগের আরও খবর


Share via
Copy link
Powered by Social Snap