মোবাইলের কারণে বাড়াচ্ছে মৃত্যুর মিছিল!

October 30, 2020, 10:07 am

মোবাইলের কারণে বাড়াচ্ছে মৃত্যুর মিছিল!

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) সংগঠনের চেয়ারম্যান ও চলচ্চিত্রের নন্দিত নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন সম্প্রতি বলেছেন, ‘সড়ক কোনো আনন্দের জায়গা নয়, একটি বিপজ্জনক জায়গা। প্রতি মুহূর্তে এখানে গাড়ি চলছে, দুর্ঘটনা ঘটছে।’ এই বিপজ্জনক জায়গায় বিপদ আরো বাড়াচ্ছে মোবাইল ফোনের অসতর্ক ব্যবহার। শুধু সড়কপথে নয়, রেলপথেও মোবাইল ফোন কেড়ে নিচ্ছে অনেকের জীবন।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। একাধিকবার এই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান করা হয়েছে। কিন্তু এ কঠোর আইনের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর ব্যাপক উদ্যোগেরও প্রয়োজন আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

পথ চলতে মোবাইল ফোনের অসতর্ক ব্যবহার যে কতটা বিপজ্জনক এর সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ ইডেন মহিলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী আকলিমা আক্তার জুঁই। গত শনিবার রাজধানীর বিজয় সরণিতে উবারের মোটরসাইকেল থেকে পড়ে আহত হন তিনি। গত সোমবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশ উবার চালককে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, রিংটোন পেয়ে ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনসেট বের করতে গিয়ে পড়ে যান জুঁই।

গত ২২ মার্চ টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হাতিলা মধ্যপাড়ায় মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন ধরে হাঁটছিলেন জেসমিন নাহার আছমা (২৭)। ট্রেন আসার শব্দ ও কম্পনও তাঁকে মোবাইল ফোনে মগ্নতা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। একেবারে নিবৃত্ত হন ট্রেনের ধাক্কা খাওয়ার পর। স্থানীয় লোকজন জানায়, ঢাকা থেকে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেন পেছন থেকে জেসমিনকে ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

গত ২২ জানুয়ারি রাজবাড়ী রেলস্টেশনের কাছেই মোবাইলে কথা বলা অবস্থায় রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে ফিরোজ সরদার নামের এক নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। গত ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়েন হজরত আলী স্বাধীন নামের এক ব্যক্তি।

২০১৬ সালের ১৭ মে বাঁ হাত দিয়ে কানে মোবাইল ফোন সেট ধরে কথা বলতে বলতে আর ডান হাতে আইসক্রিম খেতে খেতে রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওবায়দুল্লাহ (২৫)। এ অবস্থায় কমলাপুরগামী একটি ট্রেনে কাটা পড়ে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

সরকারি নথির তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেলপথে বছরে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয় ট্রেনে কাটা পড়ে। সম্প্রতি তাদের বড় একটি অংশের মৃত্যু হচ্ছে মোবাইল ফোন ও হেড ফোনের অসতর্ক ব্যবহারের কারণে। ঢাকা রেলওয়ে থানার (কমলাপুর) ওসি রকিবুল হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেলপথে প্রতি মাসেই ট্রেনে কাটা পড়ে ১০-১৫ জনের মৃত্যু হয়। মোবাইল ফোন ব্যবহারসহ ও অন্যান্য অসতর্কতার কারণে এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। এসব মৃত্যুর মধ্যে আত্মহত্যাও রয়েছে।

সড়কপথেও মোবাইল ফোনের অসতর্ক ব্যবহার মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ করছে। ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই মাদারীপুরের ঘটকচর এলাকায় বরিশাল থেকে ঢাকাগামী সুগন্ধা পরিবহনের একটি বাসের চালক মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। তাঁর এ অসতর্কতার কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। এ ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়।

কিন্তু এসব দুঃখজনক ঘটনার পরও রাজধানীসহ সারা দেশে বাস-ট্রাক-মাইক্রোবাস-অটোরিকশার চালকদের দ্রুতগতিতে চলার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলার দৃশ্য প্রায়ই চেখে পড়ে। মোটরসাইকেল চালকদের মোবাইল ফোনে আলাপরত অবস্থায় কাত হয়ে বা মাথা ঝুঁকিয়ে অমনোযোগী হয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। চলন্ত অবস্থায় গুগলে পথের নিশানা বা রাইড শেয়ার খুঁজে নিতে অভ্যস্ত অনেকে। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তায় চলাচল ও রাস্তা পারাপার এখন অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শাস্তির বিধানের পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরির ব্যাপক কর্মসূচিও গ্রহণ করতে হবে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘সড়ক, রেল, নৌপথ—সব ক্ষেত্রেই মোবাইল ফোনের অসতর্ক ব্যবহার ভয়ানক সমস্যা তৈরি করছে। কিন্তু এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে সরকারের তেমন উদ্যোগ নেই। মোবাইল ফোন কম্পানিগুলোও এ বিষয়ে উদাসীন। এ ক্ষেত্রে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা কেন থাকবে না?’ গাড়িচালকদের পাশাপাশি পথচারীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা দরকার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

Comments are closed.

এই বিভাগের আরও খবর


Share via
Copy link
Powered by Social Snap